Skip to main content

লোকাল ট্রেনে এক রাত্রি (কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া)

নিলয় ভাইয়ার কাছে ঢাকার লোকাল ট্রেনের গল্প শুনে বেশ "এডভেঞ্চারাস" মনে হবার দরুণ চড়ার সখ ছিলো। 
যদিও সবাই মানা করতো সবসময় যে, লোকাল-ট্রেন খুবই বাজে আর রাতের বেলাতো রীতিমতো নরক!
কোনো মহিলার চড়বার যোগ্য না! 
কিন্তু একদিন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সেই নরক দেখার সৌ/দূর্ভাগ্য হয়েছিলো একবার।
.কিশোরগঞ্জ হাওড়ের আশেপাশের এলাকা
রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ভ্রমণ শেষে  পরদিন আমরা যাবো কিশোরগঞ্জ হাকিশোরগঞ্জ হাওড়ে আমরা সবাইওড় ঘুরতে।









কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ঘুরে পানি পথে কুমিল্লা দিয়ে বেরিয়ে চিটাগং ব্যাক করবো এরকম প্ল্যান ছিলো আমাদের!
কিন্তু শেষ দিকে এসে নানান কারণে একটার পর একটা প্ল্যান ভেস্তে যায়। 
আর আমরা টুকুর টুকুর করে ভেঙে ভেঙে আসতে থাকি! 

এভাবে আমরা কুমিল্লা অব্দি যেতে না পেরে  ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত আসতে পারি।
 ওখান থেকে আর কোনো না পেয়ে, আমরা যখন লোকাল ট্রেনে উঠি তখন সম্ভবত প্রায় রাত ৮/৯টা!
.
অন্তত কোনোমতে কুমিল্লা অব্দি যেতে পারলেও হচ্ছে, ওখান থেকে অহরহ চিটাগাংএর গাড়ি পাওয়া যাবে।   
চিন্তা একটাই, ট্রেনে অন্তত একটা সিট পেতেই হবে।
পুরাটা রাস্তা শিহাব ভাইএর পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। 
[বিঃদ্রঃ 
অষ্টগ্রাম যাবার পথে অটোগাড়ি উল্টে এক্সিড্যান্ট করে আমাদের একদল, যাদের মাঝে শিহাব ভাই পায়ে ব্যাথা পায় ভয়াবহভাবে] 
ট্রেন আসতেই যে যেই বগিতে পেরেছি, উঠে পড়েছি। 
কপালগুনে একটা সিট পাওয়া যায়। 
এইবার শুরু হলো আমার নরক যন্ত্রণা। 
এমন ভীড় যে দাঁড়ানোরও উপায় নাই ঠিকভাবে। 
দাঁড়িয়ে কোনোমতে যে একটু ঝিমাবো, একটু পরপরই নানান জাতের ফেরিওয়ালা আসতে যেতে থাকে। 
ভাবলাম একসময় এসব থামবে!
কিসের কি!
মানসিকভাবে খুব স্ট্রং থাকার চেষ্টা করছি আর ফেরিওয়ালাদের প্রচুর গালি দিচ্ছি মনে মনে। 
বাবর ভাই আর লাভলু ভাই আমার জন্য দূরে কোথাও যেতে পারছেন না বিধায় নিজেরাও স্বস্তি নিয়ে ফাঁকা জায়গায় যেয়ে দাঁড়াতে পারছেন না।
.
খিদা, ক্লান্তি, গ্যাঞ্জাম, চেঁচামেচি, হৈচৈ, দুর্গন্ধ, খিঁচে থাকা মেজাজ আর স্থিরভাবে দাঁড়ানোর জায়গাটাও না পাওয়া... 
সব মিলিয়ে দান্তের অলিঘিয়েরির পারগেটরির কোনো একটা স্তরে আছি বলেই মনে হলো। 
.
এতকিছুর পরও একটা সখ মিটেছে।
অথবা দুটো। ব্রাক্ষ্ণবাড়িয়া যাবার পথে স্পিডবোটে
জীবনে প্রথম লোকাল ট্রেনে চড়ার সখ মেটা আর
স্পিডবোটে চড়েছিলাম ওইদিন।





 

অনেকদূর পেরিয়ে প্রথম সুযোগেই আমাকে এক সিটে বসিয়ে দিলেন উনারা। 
তারপর একসময় ভীড় হালকা হয়ে আসে। 
সবাই বসে একটু করে ঝিমানোর সুযোগ পেয়েছিলো বোধহয়। 
পাশে বাবরভাই, সামনে লাভলু ভাই থাকায় আমি জানালার পাশে ঘন্টাখানেকের একটা ঘুমই দিয়ে ফেলেছিলাম।
.
ট্রেন থেকে নেমে শুরু হলো আরেক যুদ্ধ! 
কুমিল্লা থেকে কোনো বাস পাওয়া যাচ্ছেনা চিটাগাং-এর! 
রাত বাজে তখন প্রায় ১টা!
হোটেল নুরজাহানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, যেহেতু সব বাসই এখানে ব্রেক দেয় যাবার পথে। কোনো একটায় উঠে যাবো সবাই।
পরদিন কক্সবাজার ফিরে অফিস হবে যেভাবেই হোক!
সবারই কমবেশি একই তাড়া, ফিরতেই হবে যেভাবেই হোক।
শেষে সুবিধা করতে না পারায় একসাথে যাবার চিন্তা ছেড়ে, যে যারযার মতো চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। 
সবার শেষে রয়ে গেলাম আমি, দেবুদা, শিহাবভাই আর শাহেদ ভাই।
একটাও সময় দেবুদাও চলে গেলেন বাস একটা ধরে। 
কিন্তু কিছুতেই বাস পাওয়া যায়না।
পাওয়া গেলেও কোনো সিট নেই।
কুমিল্লা থেকে চিটাগং এত লম্ববা রাস্তা দাঁড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব!   
শেষে বাধ্য হয়ে বাঙ্কের উপর বসেই যাবার সিদ্ধান্ত হতেই, শাহেদ ভাই একটা বাসে আমাকে উঠে যেতে বললেন।
একাই যাব এই প্রচন্ড দুশ্চিন্তা আর ভয় নিয়েও দেরি না করে দৌড়ে উঠে পড়লাম! 
.
এত রাতে একা, কুমিল্লা থেকে চিটাগং যাব তাও আবার কোনো সিট নেই যেখানে। 
নিজেকে প্রবোধ দিলাম "যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিবো" পণ করেইত বেরিয়েছি!  
আমি উঠে ঘুরতেই দেখি শিহাবভাই উঠে এসেছেন! 
শান্তি পেয়েছিলাম অনেক উনাকে দেখে! 
উনি বনেটের  উপর বসলেন আর আমি গাড়ির দরজার কাছে যে ছোট্ট টুলের মত থাকে ওটায় বসলাম! 
একেত বসেছি সামনে। 
সামনে থেকে কেটে আসা অসহ্য বাতাস আর একটু পরপর অন্ধকার চিড়ে আসা লাইটের ছটা একদম রেটিনা ভেদ করে যাওয়ার যন্ত্রণা, তায় আবার ব্যাপক ক্ষুধার্ত।
আর সাথে লোকাল ট্রেনের জার্নির ধকলতো আছেই। 
শেষমেশ অবস্থা এমন হয়েছে যে, অসহ্য ক্ষুধা, ক্লান্তির শেষ সীমা পৌঁছেও গাড়ির ঝাঁকুনিতে ঝিমুনি ঠিকই আসছে!
.
ঝিমিয়ে সামনের পিলারের মত রডে বাড়ি খেয়ে আবার জেগে যাচ্ছি! 
জেগেই দেখে নিচ্ছি শিহাবভাই আছেন কিনা।
 তারপর আবার ঝিমুচ্ছি।
অনেকটা পরাবাস্তব জগতে চলে গেছি যেনো! 
ঝিমুনি আর জেগে থাকা সব গুলিয়ে গ্যাছে।     
শেষমেশ নামলাম চিটাগং। 
সিএনজি নিয়ে যাবার পথে শিহাবভাইকে নামিয়ে দিয়ে বাসায় যেতে যেতে প্রায় ভোর ৪টা! 
পরদিন কিসের অফিস, কিসের কি! 
দুপুর অব্দি মরার মত ঘুমালাম!

Popular posts from this blog

অভয়নগর ভয়: টেরাকোটার খোঁজে

টেরাকোটা, মন্দির, যুগের-কালের সাক্ষী রেখে সুউচ্চ দাঁড়িয়ে থাকা ইমারত দর্শন আমার ভীষণ আগ্রহের। মনে পড়ে, দিনাজপুরের দিকে যেবার গেলাম, কান্তজীর মন্দির দেখার জন্য কত কাহিনী। একদিন গেলাম বন্ধ, পরেরদিন গেলাম বন্ধের ঠিক আগে দিয়ে তাই ঢুকতে দিলনা, তারপর অবশেষে তৃতীয় ধাক্কায় সঠিক সময়ের ব্যাপার বুঝে যেতে পড়েছিলাম তাও একদম সন্ধ্যার ঠিক আগে মুহূর্তে। ভালোভাবে দেখা হয়নি। ১১-শিব-মন্দির দেখতে যেয়েও আমাদের সেরকমই ঝক্কি হলো। এমন না যে এটায় কান্তজী'র মন্দিরের মতো সাঁঝের বেলায় মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেবার ব্যাপার ছিল, তবে ঘোর গহীনে, প্রায় বনের মাঝে অন্ধকারে দেখবার কোনো সুযোগই থাকতোনা। আমার ইচ্ছে ছিল, বিকেল বিকেল পৌঁছে, মন্দিরের মঠে বিকেল আর সন্ধ্যা ঘনানো দেখবো। কিন্তু সেদিন আমাদের ঘোরার শেষ দিন, অথচ বাকি ছিল কত কিছু, সে জন্য দিনের পরিকল্পনাটা একটু ঘটনাবহুল ছিল। খুলনা থেকে বাগেরহাট একদিকে, আর অভয়নগর একদম সোজা উল্টো দিকে, যশোরের রাস্তায়। চুই-ঝালের গরুর গোস্ত দিয়ে পেট টান করবার পর মনে হলো একটা ভাত ঘুম দেই কিন্তু সে সুযোগ নেই। সবাইকে ঠেলেঠুলে নিয়ে আবার বসে চেপে বসলাম অভয়নগরের উদ্দেশ্যে। ওখানে নেমে মন্দিরের...

শ্রীহট্ট দিনলিপিঃ তানিমের গোলাপিনেশা

তানিমকে আমেরিকায় স্কলারশিপের জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখতেসি বেশ ক'বছর ধরেই। হুট করেই সেবার যখন সুখবরটা পেলাম যে ওর স্কলারশিপ কনফার্ম, বিশ্বাস হতে চায়নি। ১৫/১৬ তারিখের দিকে শুনি ২২ তারিখে ওর আমেরিকার ফ্লাইট। আমার মাথায় কনগ্রাচুলেশন জানানোর আগে শুরুতেই যেইটা মাথায় কাজ করেছিল তা হলো, "আয়হায়! তানিমের না আমাকে ওর নতুন রেসিপির বিরিয়ানী রান্না করে খাওয়ানোর কথা! একবার আমেরিকা পার হইলেত আর ওকে পাবার সম্ভাবনা প্রায় নাই! সেজন্য ভাবলাম সামনে যে ৩দিন ঈদের ছুটি আছে, তাতে খুব ঝক্কি-ঝামেলার হলেও সিলেট ঢুঁ মেরে আসি। অন্তত বিরিয়ানী খাই না খাই ছেলেটার সাথে একবার দেখা করা উচিৎ। কে জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা। তানিমের সাথে কথা হলে জানলাম, কোভিড টেস্টের কারণে সে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা। বিরিয়ানী রান্নাতো অনেক দূরের কথা। কিন্তু একেতো লকডাউন, অফিসের কাজের প্রচুর চাপ, আমি ৩/৪ দিন না থাকলে যে কেউ ব্যাকাপ দিবে এমন লোক নেই! তারউপর আমার লাইন-ম্যানেজার ছুটিতে তার দেশে যাবে। তার কাজ, দায়িত্ব বুঝে নেয়া সহ আর দৈনন্দিন নিত্যদিনের ঝামেলাতো ছিলোই। সুতরাং কাজের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। সব মিলিয়ে আমারও ...