Skip to main content

শ্রীহট্ট দিনলিপিঃ তানিমের গোলাপিনেশা

তানিমকে আমেরিকায় স্কলারশিপের জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখতেসি বেশ ক'বছর ধরেই। হুট করেই সেবার  যখন সুখবরটা পেলাম যে ওর স্কলারশিপ কনফার্ম, বিশ্বাস হতে চায়নি।

১৫/১৬ তারিখের দিকে শুনি ২২ তারিখে ওর আমেরিকার ফ্লাইট। আমার মাথায় কনগ্রাচুলেশন জানানোর আগে শুরুতেই যেইটা মাথায় কাজ করেছিল তা হলো,
"আয়হায়! তানিমের না আমাকে ওর নতুন রেসিপির বিরিয়ানী রান্না করে খাওয়ানোর কথা! একবার আমেরিকা পার হইলেত আর ওকে পাবার সম্ভাবনা প্রায় নাই!

সেজন্য ভাবলাম সামনে যে ৩দিন ঈদের ছুটি আছে, তাতে খুব ঝক্কি-ঝামেলার হলেও সিলেট ঢুঁ মেরে আসি। অন্তত বিরিয়ানী খাই না খাই ছেলেটার সাথে একবার দেখা করা উচিৎ। কে জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা। তানিমের সাথে কথা হলে জানলাম, কোভিড টেস্টের কারণে সে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা। বিরিয়ানী রান্নাতো অনেক দূরের কথা।

কিন্তু একেতো লকডাউন, অফিসের কাজের প্রচুর চাপ, আমি ৩/৪ দিন না থাকলে যে কেউ ব্যাকাপ দিবে এমন লোক নেই! তারউপর আমার লাইন-ম্যানেজার ছুটিতে তার দেশে যাবে। তার কাজ, দায়িত্ব বুঝে নেয়া সহ আর দৈনন্দিন নিত্যদিনের ঝামেলাতো ছিলোই। সুতরাং কাজের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। সব মিলিয়ে আমারও মনে হলোনা সিলেট যাওয়া হবে আসলেও।
আমিও, মন খারাপ হলেও মেনে নিলাম যে ৩দিনের ছুটিতে কোথাও যাব নাকি আসব! এর চেয়ে বাসায় বসে আরাম করাই শ্রেয়।

কিন্তু অসম্ভব কপালের খেলা অন্যরকম হলো বলতে হবে। করোনার কারণে আমার লাইন-ম্যানেজারের ছুটিতে ওর দেশে যাওয়া পিছিয়ে যায়। ও বললো কাজ সব শেষ করে দিতে পারলে তুমি যেয়ে ঘুরে আসো।

রুমে ফিরে প্রথম মেসেজ দিলাম তানিমকে, ইন্সট্যান্ট সিলেটের ফ্লাইট বুক করলাম (ভেবেছিলাম টিকেট পাবোই না এতদেরিতে, সাথে লকডাউন তায় আবার ঈদের সময়!) জয়দাকে কল দিলাম রিটার্ন টিকিটের বন্দোবস্ত করতে!

এর ফাঁকে ফাঁকে আমার কাজ গোছানো চলতেই থাকলো। প্রায় ভোর ৪টে নাগাদ জেগে কাজ শেষ করে, সকালে অফিসে যেয়ে আরো কিছু কাজ সেরে, দুপুরের ফ্লাইট ধরলাম।
ননস্টপ সিলেটের ফ্লাইট হলেও যেয়ে দেখলাম ঢাকায় ব্রেক ফ্লাইটের। সেখানে প্রায় ঘন্টা তিনেক বাদে তারপর ঢাকা থেকে সিলেটের ফ্লাইট।

ভেবেছিলাম সিলেট নেমে দুপুরের খাবার খাবো। ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছে টের পেলাম পেটে চোঁ-চাঁ করছে। প্রচুর ঘুমও পাচ্ছিল সাথে। ভাবলাম কিছু খেয়ে একটু ঝিমিয়ে নেই।
খাবার কিনতে যেয়ে হলো আরেক কান্ড!
খাবারের বিল দিতে গিয়ে দেখি মানিব্যাগের অস্তিত্বও নাই!
অফিসে ফোন করে আমার টেবিলের ড্রয়ার চেক করালে জানলাম ওখানে ফেলে এসেছি! মানে ব্যাপারটা এমন, আমাকে উল্টো করে ঝাড়লেও একটা পয়সা বেরুবেনা! কার্ড, টাকা সব মানিব্যাগে।
জয়দা বললেন, কি আর করবা। কোনোমতে এয়ারপোর্টে নামো। আমি খাবার সাথেই নিয়ে আসবোনে।

তানিমের রান্না বিরিয়ানী খেতে কি কান্ডটাই না হয়ে যাচ্ছে একের পর এক!

তবে সিলেটের ফ্লাইটে বেশ মজা পেলাম। অন্য সব ডমেস্টিক ফ্লাইটে স্বাভাবিক দিনের মত গাদাগাদি অবস্থা ছিল না।
একমাত্র সিলেটের ফ্লাইটেই দেখলাম এক সিট ফাঁকা রেখে রেখে যাত্রী বসানো হয়েছে। সেদিন আবহাওয়াটাও কেমন অসম্ভব সুন্দর ছিল। এমন পরিষ্কার মনোহর আবহাওয়া কদাচিৎ পাওয়া যায়!

photo_2022-06-27_22-46-25.jpgজানালা ভেঙে এই মেঘের ছাদে লাফ দেয়ার ইচ্ছেটা দমন করা দূর্দমনীয় ছিল!

এবং শুধু তাই না, এর সিটগুলাও বেশ আরামদায়ক ছিল অন্যান্য ডোমেস্টিক ফ্লাইটের চিপা পরিবেশের তুলনায়! মনে হলো যেনো, সিলেটকে যে দ্বিতীয় লন্ডন বলা হয়, সেদিন সবকিছুতেই যেন তারা সে প্রমাণ দিতে চাইলো!

এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে উঠার পর জয়দা জানালেন আমাদের টাঙ্গুয়ার হাওড়ে রাত কাটানো পরিকল্পনা আর তানিমের বিরিয়ানি দিন উপর্যুপুরি হয়েছে!
একটু মন খারাপ হলো। কারণ কখনোই ছুটি আর বর্ষা একসাথে মেলেই না আমার। আর বর্ষা ছাড়া হাওড়ে যাওয়ার মানে নেই! এবার যাওবা এলাম, এখন এমন দ্বন্দ!
জয়দা বললেন, "কি করবা, বিরিয়ানী বাদ? আমি কিন্তু হাওড়ের নৌকা, গায়েনের দল, মাঝি সব ঠিক করে ফেলেছি!"

মালনিছড়া চা বাগান পার হতে হতে ফিক করে হেসে ফেললাম। এই চা বাগান নিয়ে তানিমের সাথে খুবই হাসির আর মজার একটা স্মৃতি আছে। যেবার প্রথম সিলেট গিয়েছিলাম সে সময়ের!

আমি মালনিছড়া চা বাগানের ঘ্রাণ নিতে নিতে বললাম, "তানিম আর তানিমের বিরিয়ানী আগে। হাওড়ের রাতের গানের আসর বাদ আপাদত! বেঁচে থাকলে পরে আবার আসব।"

photo_2022-06-27_22-46-23.jpg একদম জিরো থেকে বিরিয়ানীর প্রস্তুতি হলো। এমনকি আমরা বাজার থেকে লবনটাও পর্যন্ত কিনে এনেছি!


আমাদের বিরিয়ানী আয়োজন পরদিন। সেদিন ঘুম থেকে উঠলাম প্রায় দুপুর ১২/১টা। উঠেই তড়িঘড়ি গেলাম জায়েদের মার্টে বাজার নিয়ে আসতে। জায়েদকে আগেই লিস্ট দিয়ে দেয়া ছিল কি কি লাগবে তার। ও সব রেডি করে রেখে দিয়েছিল।
ছেলেটা সত্যিই কাচ্চি রানতে এলো। তাও আবার রোজা থেকে। তানিমকে সাহায্য করলো জয়দা। মাঝে দিয়ে আমি কেবল ওদের আশেপাশে ঘুরঘুর করলাম।

অসম্ভব দুর্দান্ত কাচ্চি রান্না করলো নিঃসন্দেহে। তবে ফুড কালারের ভুল রঙের কারণে, কাচ্চির রঙ হয়ে গেলো গোলাপি!

তানিম বললো, "আরে ভালো হয়েছে। আপনাদেরকে কাশ্মিরী কাচ্চি খাওয়ালাম। কাশ্মিরী কাচ্চি কিন্তু সত্যিই গোলাপি রঙের হয়!"
photo_2022-06-27_22-46-35.jpg

আমিতো রীতিমতো বোরহানি আর কোকাকোলার বোতল নিয়ে বসেছিলাম আয়েশ করে জয়দার কাজের চেয়ার দখল করে। মোটামুটি সন্ধ্যা থেকে শুরু করে রাতভর খাবো এই কাচ্চি আর সিনেমা দেখবো!

ছেলেটা এত অসমভব ভালো। সিলেট গেলে ওকে মিস করি। এরকম সুক্ষ্ণ সম্পর্কগুলো আমার জীবনে বেঁচে থাকুক বহুবছর। তানিম ভালো থাকুক সবসময়।

Popular posts from this blog

অভয়নগর ভয়: টেরাকোটার খোঁজে

টেরাকোটা, মন্দির, যুগের-কালের সাক্ষী রেখে সুউচ্চ দাঁড়িয়ে থাকা ইমারত দর্শন আমার ভীষণ আগ্রহের। মনে পড়ে, দিনাজপুরের দিকে যেবার গেলাম, কান্তজীর মন্দির দেখার জন্য কত কাহিনী। একদিন গেলাম বন্ধ, পরেরদিন গেলাম বন্ধের ঠিক আগে দিয়ে তাই ঢুকতে দিলনা, তারপর অবশেষে তৃতীয় ধাক্কায় সঠিক সময়ের ব্যাপার বুঝে যেতে পড়েছিলাম তাও একদম সন্ধ্যার ঠিক আগে মুহূর্তে। ভালোভাবে দেখা হয়নি। ১১-শিব-মন্দির দেখতে যেয়েও আমাদের সেরকমই ঝক্কি হলো। এমন না যে এটায় কান্তজী'র মন্দিরের মতো সাঁঝের বেলায় মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেবার ব্যাপার ছিল, তবে ঘোর গহীনে, প্রায় বনের মাঝে অন্ধকারে দেখবার কোনো সুযোগই থাকতোনা। আমার ইচ্ছে ছিল, বিকেল বিকেল পৌঁছে, মন্দিরের মঠে বিকেল আর সন্ধ্যা ঘনানো দেখবো। কিন্তু সেদিন আমাদের ঘোরার শেষ দিন, অথচ বাকি ছিল কত কিছু, সে জন্য দিনের পরিকল্পনাটা একটু ঘটনাবহুল ছিল। খুলনা থেকে বাগেরহাট একদিকে, আর অভয়নগর একদম সোজা উল্টো দিকে, যশোরের রাস্তায়। চুই-ঝালের গরুর গোস্ত দিয়ে পেট টান করবার পর মনে হলো একটা ভাত ঘুম দেই কিন্তু সে সুযোগ নেই। সবাইকে ঠেলেঠুলে নিয়ে আবার বসে চেপে বসলাম অভয়নগরের উদ্দেশ্যে। ওখানে নেমে মন্দিরের...

লোকাল ট্রেনে এক রাত্রি (কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া)

নিলয় ভাইয়ার কাছে ঢাকার লোকাল ট্রেনের গল্প শুনে বেশ "এডভেঞ্চারাস" মনে হবার দরুণ চড়ার সখ ছিলো।  যদিও সবাই মানা করতো সবসময় যে, লোকাল-ট্রেন খুবই বাজে আর রাতের বেলাতো রীতিমতো নরক! কোনো মহিলার চড়বার যোগ্য না!  কিন্তু একদিন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সেই নরক দেখার সৌ/দূর্ভাগ্য হয়েছিলো একবার। . রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ভ্রমণ শেষে  পরদিন আমরা যাবো কিশোরগঞ্জ হা ওড় ঘুরতে। কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ঘুরে পানি পথে কুমিল্লা দি য়ে বেরিয়ে চিটা গং ব্যাক করবো এরকম প্ল্যান ছিলো আমাদের! কিন্তু শেষ দিকে এসে নানান কারণে একটার পর একটা প্ল্যান ভেস্তে যায়।  আর আমরা টুকুর টুকুর করে ভেঙে ভেঙে আসতে থাকি!  এভাবে আমরা কুমিল্লা অব্দি যেতে না পেরে  ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত আসতে পারি।  ওখান থেকে আর কোনো না পেয়ে, আমরা যখন লোকাল ট্রেনে উঠি তখন সম্ভবত প্রায় রাত ৮/৯টা! . অন্তত কোনোমতে কুমিল্লা অব্দি যেতে পারলেও হচ্ছে, ওখান থেকে অহরহ চিটাগাংএর গাড়ি পাওয়া যাবে।    চিন্তা একটাই, ট্রেনে অন্তত একটা সিট পেতেই হবে। পুরাটা রাস্তা শিহাব ভাইএর পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।  [বি...