Skip to main content

অভয়ারণ্যের ডাকবাংলোয় একদিন

রাত দশটার দিকে বাসে চেপে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেয়া। 
 দেবুদা'র পাশাপাশি বসে গল্প শোনা আর কুটুর কুটুর গল্প করতে করতে গড়াতে থাকে সময়।
দেবুদা'কে নিয়ে আমার আগ্রহের শেষ নেই!
সে গল্প ছোট্ট দেবুর বনে হারিয়ে যাওয়া থেকে তারুণ্যে এসে মাউন্টেইন জয় করে আসা দেবুদা'র সাথে তি.গো. মাসুদরানার নস্টালজিয়ায় ডুবে ভেসে ভোর নাগাদ শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে গেলাম।
নেমে সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে বেশ দুমড়ানো মুচড়ানো রাস্তা পাড়ি দিয়ে সোজা রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের ডাকবাংলোয় যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য উঠে গ্যাছে।
.
ডাকবাংলো শব্দটাতে আমার বেশ রোমাঞ্চ লাগে কারণ ছোটোবেলায় কিশোর ক্লাসিক বা গোয়েন্দা গল্পগুলোয় এটা খুবই কমন একটা প্লট!
ভয়ানক আর ভৌতিক সব ব্যাপার ঘটতো বিভিন্ন ডাকবাংলোয়!
আর যেহেতু এই প্রথম গল্পের প্লট ডাকবাংলোয় থাকবো, ব্যাপারটায় কিশোরীদের

ডাক বাংলো
মত আলাদা একটা রোমাঞ্চ কাজ করছে।
কিন্তু পৌঁছে যখন দেখলাম এটা কল্পনার সেই কাঠের তৈরী ক্যাঁচকোঁচ তোলা কোনো বাড়ি নয় বরং ইট-সিমেন্টের ইলেকট্রিসিটির সুব্যবস্থা সহ পাকাবাড়ি, একটু হতাশই হলাম!
যেয়েই সবাই ঘন্টাখানেক ঝিমিয়ে সকালের নাস্তা তৈরী হয়ে গেলে সবাই মোটামুটি জাতস্থ হয়ে খেতে গেলাম।
ডিম-পরোটার পর ফার্স্টক্লাস এক কাপ চা খেয়ে সবাই বেরিয়ে পড়লাম অভয়ারণ্য অভিযানে!
.খাবার টেবিলে আড্ডা গল্পে


অভয়ারণ্য দেখার সুযোগ এবারই প্রথম পাওয়া।
সেজন্য বেশ কৌতূহল ছিলো।
তবে দেখা গেলো এক উল্লেখযোগ্য “জোঁক” ছাড়া অভয়ারণ্যে আর তেমন আকর্ষণীয় কিছুই দেখা গেলোনা যা ভয় দেখাতে পারে কিঞ্চিৎ!
মুফতে ছিলো কিছু হনুমানের লম্ফঝম্প আর বিস্তীর্ণ জঙ্গল এই-ই!  
 
মজা যা হয়েছে তা নিজেদের মাঝে নিজেদের কান্ডকারখানা আর গল্প আড্ডায়! 

পকৃতি-বিজ্ঞানীর দল
তবে এমন খাঁটি প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটতেও একটা আলাদা প্রশান্তি কাজ করে। 

চারপাশে এত সবুজ যে, সবুজে চোখ ঝলসে যায়!
চলে মুসাফির
মোটামুটি দুপুর নাগাদ আমাদের অভিযান (!) শেষ করে ডাকবাংলোয় ফিরে এলাম!

ঝিরির পানির মত ঠান্ডা পানিতে গোসল দেয়ার পর যে খিদেটা টের পেলাম খোদা!
কিন্তু আমাদের সংগী পুরুষগণ আশেপাশে কোন পুকুরে গোসল করতে যাওয়ায় আমরা দুই মহিলাকে খিদের চাষ অব্যাহত রাখতেই হলো!
.
ক্ষুধার জ্বালায় শেষমেশ ঘুমিয়েই গেলাম!
ফরহান ভাই এসে আমাকে আর ভাবীকে ডেকে

 
নিয়ে গেলেন খেতে! আমরা যেতে যেতে দেখলাম কজনের দু'তিনটে মুরগীর টুকরো কষে চাবানো শেষ!
নিঃসন্দেহে অসাধারণ রান্না!
দেশী মুরগীকে মশলা আর তেলে চটকে রান্না, হালকা গ্রেভী ঝোল আর তারউপর গেরস্থের ঘরের সেদ্ধ চালের ভাত...
আহা!
প্রায় দু'দিনের ভাত না খাওয়া আমি খুব ধীরে সুস্থে আরাম করে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম!
পূর্ব রাতের দীর্ঘ যাত্রার নির্ঘুমতা ও সকালের অভিযান শেষে এমন আয়েশী খাবার পর কোন পাগলে ডাক বাংলোর ভাত ঘুম রেখে অন্য কোথাও যাবে!
তাই খেয়ে দেয়ে সবাই “সাতছড়ি” রওনা দিলেও, আমি শুভ্রা ভাবী আর দেবুদা থেকে গেলাম!
৩জনে চা এর কাপ নিয়ে আরাম করে বারান্দায় বসে গল্প করতে বসে গেলাম!
গল্পের এক ফাঁকেই আর না পারতে আমি উঠে ঘুমুতে চলে গেলাম!
.
মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে দেখি সন্ধ্যা!
নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে আশপাশটা!
বুঝলাম আমাদের অভিযাত্রীদল এখনো ফেরেনি!
সম্বিত ফিরতেই বুঝলাম আমি যে গন্ডারের চামড়াজাত, মশার কামড়ে না আসলে খিদেয় ভেঙেছে ঘুম!
চোখ কচলে উঠে বসতেই ভাবীর গলা পেলাম
“উঠে গেছো মৌ! ভালো হয়েছে, আমি চা এর কথা বলে এলাম, তোমাকে ডাকতেই আসছিলাম!”
আমার কখনো “ভাবীর আহ্লাদ” জিনিসটা পাওয়া হয়নি!
মনে মনে বেশ এক প্রস্থ সুখ উপভোগ করে নিলাম! আরো এক বাক্স আহ্লাদ নিয়ে বললাম,
“ভাবী খিদে পেয়েছে!“
“আরে আমারও!”
“ও দেবুদা! খিদে পেয়েছে খুব!” (উনি আমাদের ঘুমানোর সুযোগে নান্দা-দেভ বইখানা উপভোগ করছিলেন বেশ!)
“খিদে পেয়েছে না! দাঁড়াওতো আমার কাছে বিস্কুট থাকার কথা!”
চা চলে এলে সেই বিস্কুট দিয়ে কোনমতে কাজ চালিয়ে নিলাম।
পরে আবার কেয়ারটেকারদের একজনকে দিয়ে ছোলামুড়ির খোঁজে পাঠালাম।
আশেপাশের বাজারও বেশ দূরে তাও আবার সে বাজার সম্ভবত সন্ধ্যায় পাট চুকিয়ে ফেলে!
আশা নিরাশার দুলতে দুলতে আমাদের গল্পের মাঝেই ছোলামুড়ি এসে গেলো!
খেয়ে দেয়ে আবারও চা এর ফরমায়েশ!
ভাবী ক্ষ্যামা দিলো কিন্তু আমার আর দেবুদার কাপের পর কাপ চা চললো!
.
একসময় চা এর কাপ নিয়ে বারান্দায় চলে এলাম।
আমাদের এই বাংলোর আশেপাশে আর কোনো “ঘর” জাতীয় কিসসু নেই।
চারপাশ নিকষ অন্ধকারে ডুবে আছে যার মাঝে একটুকরো আলো মাথায় করে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটা।
প্রচন্ড নিস্তব্ধতার মাঝে বিরতিহীন ঝিঁঝিঁ ডাকা আর একটা কেমন বিস্কুটের মত অচেনা ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে!
কান পেতে শোনার চেষ্টা করছিলাম জঙ্গল থেকে কোনো রকম আওয়াজ পাওয়া যায় কিনা!
একটু পরেই হৈচৈ করে অভিযাত্রীদল ফিরলো!
সেদিনের মত নৈশভোজ আর আড্ডার পর অভিযান ওখানেই সমাপ্ত!



অনেকক্ষণ জঙ্গল দিয়ে হেঁটে হুট করে খোলা জায়গায় বেরিয়েই এই পুকুর।   

ওয়াচ টাওয়ার



প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্ম  

কি সবুজ!

Popular posts from this blog

অভয়নগর ভয়: টেরাকোটার খোঁজে

টেরাকোটা, মন্দির, যুগের-কালের সাক্ষী রেখে সুউচ্চ দাঁড়িয়ে থাকা ইমারত দর্শন আমার ভীষণ আগ্রহের। মনে পড়ে, দিনাজপুরের দিকে যেবার গেলাম, কান্তজীর মন্দির দেখার জন্য কত কাহিনী। একদিন গেলাম বন্ধ, পরেরদিন গেলাম বন্ধের ঠিক আগে দিয়ে তাই ঢুকতে দিলনা, তারপর অবশেষে তৃতীয় ধাক্কায় সঠিক সময়ের ব্যাপার বুঝে যেতে পড়েছিলাম তাও একদম সন্ধ্যার ঠিক আগে মুহূর্তে। ভালোভাবে দেখা হয়নি। ১১-শিব-মন্দির দেখতে যেয়েও আমাদের সেরকমই ঝক্কি হলো। এমন না যে এটায় কান্তজী'র মন্দিরের মতো সাঁঝের বেলায় মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেবার ব্যাপার ছিল, তবে ঘোর গহীনে, প্রায় বনের মাঝে অন্ধকারে দেখবার কোনো সুযোগই থাকতোনা। আমার ইচ্ছে ছিল, বিকেল বিকেল পৌঁছে, মন্দিরের মঠে বিকেল আর সন্ধ্যা ঘনানো দেখবো। কিন্তু সেদিন আমাদের ঘোরার শেষ দিন, অথচ বাকি ছিল কত কিছু, সে জন্য দিনের পরিকল্পনাটা একটু ঘটনাবহুল ছিল। খুলনা থেকে বাগেরহাট একদিকে, আর অভয়নগর একদম সোজা উল্টো দিকে, যশোরের রাস্তায়। চুই-ঝালের গরুর গোস্ত দিয়ে পেট টান করবার পর মনে হলো একটা ভাত ঘুম দেই কিন্তু সে সুযোগ নেই। সবাইকে ঠেলেঠুলে নিয়ে আবার বসে চেপে বসলাম অভয়নগরের উদ্দেশ্যে। ওখানে নেমে মন্দিরের...

লোকাল ট্রেনে এক রাত্রি (কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া)

নিলয় ভাইয়ার কাছে ঢাকার লোকাল ট্রেনের গল্প শুনে বেশ "এডভেঞ্চারাস" মনে হবার দরুণ চড়ার সখ ছিলো।  যদিও সবাই মানা করতো সবসময় যে, লোকাল-ট্রেন খুবই বাজে আর রাতের বেলাতো রীতিমতো নরক! কোনো মহিলার চড়বার যোগ্য না!  কিন্তু একদিন, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সেই নরক দেখার সৌ/দূর্ভাগ্য হয়েছিলো একবার। . রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ভ্রমণ শেষে  পরদিন আমরা যাবো কিশোরগঞ্জ হা ওড় ঘুরতে। কিশোরগঞ্জ হাওড় হয়ে অষ্টগ্রাম দিয়ে ঘুরে পানি পথে কুমিল্লা দি য়ে বেরিয়ে চিটা গং ব্যাক করবো এরকম প্ল্যান ছিলো আমাদের! কিন্তু শেষ দিকে এসে নানান কারণে একটার পর একটা প্ল্যান ভেস্তে যায়।  আর আমরা টুকুর টুকুর করে ভেঙে ভেঙে আসতে থাকি!  এভাবে আমরা কুমিল্লা অব্দি যেতে না পেরে  ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত আসতে পারি।  ওখান থেকে আর কোনো না পেয়ে, আমরা যখন লোকাল ট্রেনে উঠি তখন সম্ভবত প্রায় রাত ৮/৯টা! . অন্তত কোনোমতে কুমিল্লা অব্দি যেতে পারলেও হচ্ছে, ওখান থেকে অহরহ চিটাগাংএর গাড়ি পাওয়া যাবে।    চিন্তা একটাই, ট্রেনে অন্তত একটা সিট পেতেই হবে। পুরাটা রাস্তা শিহাব ভাইএর পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।  [বি...

শ্রীহট্ট দিনলিপিঃ তানিমের গোলাপিনেশা

তানিমকে আমেরিকায় স্কলারশিপের জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখতেসি বেশ ক'বছর ধরেই। হুট করেই সেবার যখন সুখবরটা পেলাম যে ওর স্কলারশিপ কনফার্ম, বিশ্বাস হতে চায়নি। ১৫/১৬ তারিখের দিকে শুনি ২২ তারিখে ওর আমেরিকার ফ্লাইট। আমার মাথায় কনগ্রাচুলেশন জানানোর আগে শুরুতেই যেইটা মাথায় কাজ করেছিল তা হলো, "আয়হায়! তানিমের না আমাকে ওর নতুন রেসিপির বিরিয়ানী রান্না করে খাওয়ানোর কথা! একবার আমেরিকা পার হইলেত আর ওকে পাবার সম্ভাবনা প্রায় নাই! সেজন্য ভাবলাম সামনে যে ৩দিন ঈদের ছুটি আছে, তাতে খুব ঝক্কি-ঝামেলার হলেও সিলেট ঢুঁ মেরে আসি। অন্তত বিরিয়ানী খাই না খাই ছেলেটার সাথে একবার দেখা করা উচিৎ। কে জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা। তানিমের সাথে কথা হলে জানলাম, কোভিড টেস্টের কারণে সে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা। বিরিয়ানী রান্নাতো অনেক দূরের কথা। কিন্তু একেতো লকডাউন, অফিসের কাজের প্রচুর চাপ, আমি ৩/৪ দিন না থাকলে যে কেউ ব্যাকাপ দিবে এমন লোক নেই! তারউপর আমার লাইন-ম্যানেজার ছুটিতে তার দেশে যাবে। তার কাজ, দায়িত্ব বুঝে নেয়া সহ আর দৈনন্দিন নিত্যদিনের ঝামেলাতো ছিলোই। সুতরাং কাজের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। সব মিলিয়ে আমারও ...